Header Ads

Header ADS

অন্যের কাছে দুআ চাওয়া


অন্যের কাছে দুআ চাওয়া

 মাওলানা আলী আহমদ

খুব কাছের মানুষজন যখন আমার কাছে দুআ চায় নির্দয়ের মতো বলে দিই, আমি কারো জন্য দুআ করি না। এই অবস্থাটা আমার মাঝে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরী।

মাঝে মাঝে ভাবতাম, এভাবে যে বলি, লোকে কি কষ্ট পায়? এরকম কাঠকথা দিয়ে লোকজনকে কষ্ট দেওয়া কি ঠিক? আমার এই আচরণে কুরআন ও সুন্নাহর সমর্থন আছে কি নেই, ইত্যাদি।

তবে আমার শক্ত লজিক ছিল। আমি খাবার খেলে যদি অন্যের ক্ষিদে না মেটে, আমি অষুধ সেবন করলে যদি অন্যের রোগ না সারে তাহলে আমি বা অন্যকেউ ভিন্ন কারো জন্য দুআ করলে কাজ কেন বা কীভাবে হবে?

অবশ্য ব্যতিক্রমকে স্বীকার করার মানসিকতা আমার এখন, তখন ও সবসময় ছিল এবং এটা আমি ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর।

ধরা যাক, তালহা নামক ছেলেটাকে তার বাবা সীমাহীন আদর, সোহাগে বড়ো করেছেন। লোকটার আছে অঢেল সম্পদ। তার একমাত্র ছেলে তালহাকে প্রতিদিন হাতখরচের জন্য যদি দশ হাজার টাকা করে দেয় তবুও গায়ে লাগবে না। এবং তিনি তার ছেলেকে পর্যাপ্ত হাতখরচ দেন।

কিন্তু একদিন এক হাজার টাকার বিশেষ প্রয়োজন দেখা দিলো তালহার। সেদিন তার বাবার কাছে সরাসরি টাকা না-চেয়ে বাবার বন্ধুকে গিয়ে বলল, আঙ্কেল, আমার এক হাজার টাকার বিশেষ প্রয়োজন। বাবাকে বলে টাকাটা উদ্ধার করে দিন না!

এই যে তালহা একটা সিচুয়েশন তৈরী করল এটা তার বাবার জন্য যেমন চরম লজ্জাকর, বাবাকে পরোক্ষভাবে অপমান করা, বাবার পিতৃত্বকে কলুষিত করা ঠিক তেমন আল্লাহর কাছে সরাসরি না-চেয়ে অন্যের মাধ্যমে চাওয়াও -নাউযুবিল্লাহ- আল্লাহকে পরোক্ষভাবে অপমান করা, আল্লাহর সর্বব্যাপী রহমতকে কলুষিত করা।

কারণ, সাধারণ বাবা যদি এমন পরিস্থিতিতে অসাধারণ লজ্জার মুখোমুখি হোন তবে আল্লাহ তাআলা কেন হবেন না! তিনি তো 'গায়ূর' আত্মমর্যাদাশীল।

একজন বাবা তার ছেলের প্রতি যতটুকু মহব্বত রাখেন তারচে' বেহিসাব গুণ বেশি আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদেরকে মহব্বত করেন। 'জো না মাঙে উস সে তু বেজার হ্যায়!' আল্লাহর কাছে যে চায় না তার প্রতি তিনি নারাজ, অসন্তুষ্ট।

পবিত্র কুরআনে তিনি সরাসরি বলেছেন, উদ'ঊনী আসতাজিব লাকুম। তোমরা আমাকে ডাকলেই তোমাদের ডাকে আমি নিশ্চিত সাড়া দেব। এখানে কারো মধ্যস্থতার কথা ইঙ্গিতেও তিনি বলেননি।

আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত পেতে হলে কোনো ওয়াকীল এর প্রয়োজন নেই। ওয়াকাফা বিল্লাহি ওয়াকীলা। ওয়াকীল হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট। ওয়ারাহমাতী ওয়াসিআত কুল্লা শাইয়িন। আমার অনুগ্রহ সবকিছুকে বেষ্টন করে আছে।

আগেও বলেছি, ব্যতিক্রমকে আমি স্বীকার করি। কোনো মুস্তাজাবুদ দা'ওয়াহ -যার দুআ আল্লাহ ফিরিয়ে দেন না- পেয়ে গেলে তার কাছে দুআ চাইতেই পারেন। তাছাড়া হাদীসে আমরা পাই, মাতাপিতা সন্তানের জন্য যে দুআ করেন তা শোনা হয়, কবুল করা হয়। সেই হিসেবে দুআ চাইতে হলে মায়ের কাছে, বাবার কাছে যান। এটাই দুআ চাওয়ার প্রকৃত স্থান।

কাউকে বাসায় দাওয়াত করে, খোরমা-পোলাও খাইয়ে, হাতে আরো কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে দুআ চাওয়ার কোনো মানে হয় না।

আপনার যদি ধারণা হয়, ওরা সৎবান্দা; তাদের দুআ আল্লাহ তাআলা ফিরিয়ে দেবেন না তাহলে এক কাজ করুন, ঐসমস্ত ব্যক্তিসহ পৃথিবীর সকল সৎমানুষ আপনার জন্য দুআ করবে, খাওয়ানো-দাওয়ানো লাগবে না, টাকাও গুঁজে দিতে হবে না; শুধু আপনি সৎ হয়ে যান। সর্বদিকে সৎ হয়ে গেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার জন্য পৃথিবীর সকল মুসলমান দুআ করবে।

আমি আপনি এমনকি পৃথিবীর সকল মুসলমান, পুরুষ হোক কিংবা মহিলা, জোয়ান হোক অথবা বুড়ো যখনই ফরজ ওয়াজিব সুন্নাত নফল যে নামাযই পড়ুক আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি তাকে পড়তে হয়। আমাদের অতিপরিচিত এই আত্তাহিয়্যাতু-তে আছে, আসসালামু আলাইনা ওয়াআলা ইবাদিল্লাহিস সালিহীন। অর্থাৎ, আমাদের ওপর ও আপনার যত সৎবান্দা আছে সকলের ওপর শান্তি বর্ষণ করো, হে আল্লাহ!

তো, আপনি সৎ হয়ে গেলেই কেল্লাফতে। অটোমেটিক পৃথিবীর সকল নামাযির দুআ পেয়ে যাচ্ছেন।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বোঝার তাওফীক দান করুন!

পুনশ্চ:

দুআ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত। এই দুআ চাওয়ার প্রতি আমি নিরুৎসাহিত করছি না। আস্থাভাজন মানুষের কাছে দুআ চাইতেই পারেন। কেবল স্মরণ করিয়ে দিতে চাচ্ছি যে, অন্যের কাছে দুআ চাইতে চাইতে আমরা এই পুণ্যপূর্ণ ইবাদাত থেকে দিনদিন সরে দাঁড়াচ্ছি। এটা ভয়ঙ্কর।

আমার প্রয়োজনের কথা আমার মাবূদের কাছে আমার মতো করে গুছিয়ে পৃথিবীর আর কেউই বলতে পারবে না।

পুনশ্চ ২:

ড. খন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর স্যার রাহিমাহুল্লাহ ও শাইখ আহমাদুল্লাহ হাফিযাহুল্লাহ-এর লেকচার শোনে প্রাণিত হয়ে এই কথা আপনাদেরকে বলা।

আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে উত্তমতর প্রতিদান দিন!

No comments

Powered by Blogger.