উলামা-ই কিরামের মৃত্যু ও একটি হাদিসের আবেদন
উলামা-ই কিরামের মৃত্যু ও একটি হাদিসের আবেদন
আবদুল্লাহ বিন আমর বিন 'আস
-রাযিয়াল্লাহু তাআলা আনহু- থেকে বর্ণিত,
তিনি বলেন, রাসূল
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إن الله لا يقبض العلم انتزاعا ينتزعه من العباد ولكن يقبض العلم بقبض العلماء، حتى إذا لم يبق عالما اتخذ الناس رؤوسا جهالا، فسئلوا فأفتوا بغير علم، فضلوا وأضلوا.
متفق عليه.
নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের থেকে
হঠাৎ ইলমকে উঠিয়ে নেন না বরং আলিমদেরকে উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে ইলমকে দুনিয়া থেকে
ওঠাবেন। অবশেষে যখন আর কোনো আলিম থাকবেন না তখন লোকজন মূর্খদেরকে তাদের নেতা
বানিয়ে নেবে এবং নানান বিষয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করবে; আর
তারা না-জেনেই সমাধান দিয়ে নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করবে।
(মুত্তাফাকুন আলাইহ)
হাদীসবিজ্ঞানীগণ এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, আল্লাহর
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই হাদীস দ্বারা উম্মতকে জ্ঞানার্জনের প্রতি
উৎসাহ দিচ্ছেন। এই জ্ঞানার্জনটা হতে হবে উলামা-ই কিরাম জীবিত থাকাবস্থায় সরাসরি
তাঁদের সাহচর্যে থেকে।
যদিও লোকজনের সামনে কুরআন ও হাদীস আছে তবুও
উলামা-ই কিরাম থেকে জ্ঞানার্জন করতে হবে। কারণ,
তাঁরাই মানুষের জন্যে
কুরআন ও হাদীসের সঠিক মর্ম তোলে ধরেন। তাঁরা দ্ব্যর্থক আয়াত ও হাদীসের মাঝে সমন্বয়
সাধন করেন এবং তার যথাযথ সমাধান পেশ করেন। অন্যদিকে বিদআতপন্থীগণ কুরআন ও হাদীসের
মূলার্থে ওলট-পালট করে, অসংলগ্ন ব্যাখ্যার মাধ্যমে
নিজেরা পথভ্রষ্ট হয় এবং সাধারণ জনগণকে বিপথগামী করে।
হাদীসবিজ্ঞানীগণ আরো বলেন, জ্ঞানার্জনে
কেবল বইপুস্তক যথেষ্ট নয়। শুধু বই পড়ে কেউ বিদ্যান্বেষী হতে পারে না। প্রকৃতার্থে
নিজেকে বিদ্যার্থীর সংজ্ঞায় ফেলতে চাইলে কিতাব তথা বইপুস্তকের সাথে উলামা-ই
কিরামের দ্বারস্থ হতে হবে।
কেউ যদি তার পুরো জীবনটাই বইয়ের গোডাউনে
কাটিয়ে দেয় তবুও সে সঠিকার্থে বিদ্যার্জন থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবে। এজন্য বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ
বলেছেন,
من كان شيخه كتابه فخطؤه أكثر من صوابه.
যে ব্যক্তি বই-পুস্তককে তার শাইখ তথা শিক্ষক
বানিয়ে নেবে তার জীবনের দফতরে সঠিক সিদ্ধান্তের তুলনায় ভুল সিদ্ধান্তেরই জয়জয়কার
পরিলক্ষিত হবে।
আজকাল তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি, একজনের
পর আরেকজন উলামা-ই কিরাম আমাদেরকে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। এই অবস্থায় তাঁদের পরপ্রজন্ম
যদি তাঁদের শূন্যস্থানকে পুরণ না-করে তাহলে কী হবে?
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
اتخذ الناس رؤوسا جهالا، فسئلوا فأفتوا بغير علم، فضلوا وأضلوا.
লোকজন অজ্ঞদেরকে তাদের নেতা বানিয়ে নেবে এবং
নানান বিষয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করবে আর মূর্খরা না-জেনে, না-বোঝে
দ্বীনী সমাধান দিতে শুরু করবে। এতে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং অন্যকেও
বিপথগামী করবে।
এজন্য তাঁদের ছেড়ে যাওয়া আসনে মূর্খরা বসার
আগে আমাদেরকেই বসতে হবে। হোক সেটা ফাতওয়া প্রদানের আসন কিংবা সামাজিক দায়িত্বের
চেয়ার অথবা শিক্ষাদানের মসনদ।
আল্লাহ তাআলা বলেন, কুল্লু
নাফসিন যাইক্বাতুল মাউত। সে হিসেবে আলিম,
জাহিল তথা সর্বস্তরের
মানুষকে মরতে হবে এবং প্রিয়জন, শ্রদ্ধেয়জনের মৃত্যুতে
আমরা শোক প্রকাশ করব এটাই স্বাভাবিক।
মাইকেল জ্যাকসন নামে একজন ভদ্রলোক ছিল। খুবই
পরিচিত। লোকটা দেড়শ বছর বাঁচতে চেয়েছিল। এজন্য কারো সাথে হাত মেলানোর সময় দস্তানা
পরত, মুখে মাস্ক লাগাত। তার দেখাশোনার জন্য বাড়িতে অভিজ্ঞ বারোজন
ডাক্তার রেখেছিল, যারা তার চুল থেকে নোখ
অবধি প্রতিদিন পরীক্ষা করত। খাবার খেত ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে।
তাকে প্রতিদিন ব্যায়াম করানোর জন্য পনেরোজন
লোক নিযুক্ত ছিল। এভাবেই সে দেড়শ বছর বেঁচে থাকার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছিল।
লোকটা ঘুমাত অক্সিজেনযুক্ত বিছানায়। নিজের
জন্য অর্গান ডোনার নিযুক্ত করে রেখেছিল -যাদের খরচ নিজে বহন করত- যাতে প্রয়োজন
পড়লেই তারা জ্যাকসনকে তাদের কিডনি,
ফুসফুস, চোখ
ইত্যাদি অঙ্গ দিতে পারে।
এতো চেষ্টা করেও সে জয়ী হতে পারেনি। হেরে
গিয়েছিল। মাত্র পঞ্চাশ বছর বয়সে মারা যায়। পঁচিশে জুন ২০০৯ সালে তার হৃৎপিণ্ড
স্তব্ধ হয়ে যায়। নিজের ঘরে থাকা বারোজন ডাক্তারের অভিজ্ঞতা কোনোই কাজে আসেনি।
লস এঞ্জেলস ও ক্যালিফোর্নিয়ার সমস্ত ডাক্তার
একত্রে চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারেনি। জীবনের শেষ পঁচিশ বছর ডাক্তারের পরামর্শ
ছাড়া এক পা-ও সামনে এগুত না লোকটা। যে নিজেকে দেড়শ বছর বাঁচিয়ে রাখার স্বপ্ন দেখত
তার স্বপ্ন অধরাই থেকে গিয়েছে।
মাইকেল জ্যাকসনের অন্তিম যাত্রার লাইভ দেখেছিল
২.৫ মিলিয়ন লোক; যা পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে
বড়ো লাইভ টেলিকাস্ট। তার মৃত্যুর দিন অর্থাৎ পঁচিশে জুন ২০০৯ সালে ৩.১৫ মিনিট
উইকিপিডিয়া, টুইটার ও এওএল-এর ইন্সট্যান্ট ম্যাসেঞ্জার বন্ধ হয়ে
গিয়েছিল। গুগলে আট লাখ লোক একসাথে মাইকেলকে সার্চ করেছিল। অতিরিক্ত সার্চের কারণে
গুগলে ট্রাফিক জ্যাম হয়ে গিয়েছিল। প্রায় আড়াই ঘণ্টা গুগল কাজ করেনি।
মৃত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাতে গিয়ে নিজেই হেরে
যায় মৃত্যুর কাছে। সাজানো পৃথিবীর সাজানো জীবন ফেলে স্বাভাবিক মৃত্যুর বদলে সাজানো
মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করেছে।
মাইকেল জ্যাকসনের ভক্তরা এতোসব করেও তাকে মৃত
থেকে জীবিত করতে পারেনি। এটা সম্ভবও নয়। তাহলে আমরা কীভাবে হাহুতাশের মাধ্যমে
উলামা-ই কিরামকে মৃত থেকে জীবিত করব?
এটা কি আদৌ সম্ভব?
তারচে বরং চলুন, হাহাকার
না-করে সুন্নাহ মুতাবেক শোক প্রকাশ করে তাঁদের রেখে যাওয়া আদর্শকে নিজ জীবনে ও
সমাজে বাস্তবায়ন করি। তাঁদের ছেড়ে
যাওয়া আসনকে এতিম হওয়া থেকে বাঁচাই। এবং যাঁরা এখনও সুস্থ আছেন তাঁদের থেকে
পূর্ণরূপে উপকৃত হই, তাঁদের জ্ঞান-অভিজ্ঞতা
নিজেদের ভেতরে ধারন করি।
সর্বোপরি আমরা যোগ্য হই তাঁদের মত এবং তাঁদের
শূন্যস্থান যথাযথভাবে পুরণ করি।
.png)

No comments