Header Ads

Header ADS

সূচনার আগে...

সূচনার আগে...


ইসলামের আবির্ভাবের ঠিক আগের যুগে আরব-উপদ্বীপে আরবিভাষার উৎপত্তি ঘটে। প্রাক-ইসলামি আরব-কবিগণ যে আরবিভাষা ব্যবহার করতেন, তা ছিল অতি উৎকৃষ্ট। তাদের লেখা কবিতা মূলত মুখেমুখেই প্রচারিত ও সংরক্ষিত হত। আরবিভাষাতে সহজেই বিজ্ঞান ও শিল্পের প্রয়োজনে নতুন নতুন শব্দ ও পরিভাষা তৈরি করা যেত এবং আজও তা করা যায়। ইসলামের প্রচারকগণ সপ্তম শতাব্দীতে আরব-উপদ্বীপের সীমানা ছাড়িয়ে এক বিশাল আরব-সাম্রাজ্য গড়তে বেরিয়ে পড়েন এবং প্রথমে দামেশক ও পরে বাগদাদে তাদের রাজধানী স্থাপন করেন। এ সময় ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী এক বিশাল এলাকা জুড়ে আরবি প্রধান প্রশাসনিক-ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা হত। ভাষাটি বাইজেন্টাইনীয় গ্রিক  ফার্সি ভাষা থেকে ধার নিয়ে এবং নিজস্ব শব্দভাণ্ডার  ব্যাকরণ পরিবর্তন করে আরও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।

নবম  দশম শতকে বাগদাদে এক মহান বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন সম্পন্ন হয়। সে সময় বিশ্বের অপরাপর প্রাচীন ভাষা, বিশেষত গ্রিক ভাষার বহু প্রাচীন বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক লেখা আরবিতে অনুবাদ করা হয়। এগুলোতে আবার আরবি চিন্তাবিদগণ নিজস্ব চিন্তা সংযোজন করেন। পরবর্তীতে আরব-স্পেনে এই জ্ঞানচর্চাই ইউরোপে মধ্যযুগের অবসান ঘটিয়ে রেনেসাঁসের সূচনা করেছিল। আরবিই ছিল একাদশ শতকে মনুষ্য জ্ঞানভাণ্ডারের বাহক ভাষা এবং এই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাচীন গ্রিক  লাতিনের উত্তরসূরি। 

আরব সভ্যতা বলতে কেবল আরব জাতি বা ইসলামকে বোঝায় না; এই ভাষার মহিমা এই যে, বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর মানুষকে এটি আকৃষ্ট করেছিল। বিস্তীর্ণ আরব-সাম্রাজ্যের নানান জাতের মানুষ আরবিভাষার ছায়ায় এক বৃহত্তর সমৃদ্ধ আরব-সভ্যতার অংশ হিসেবে একতাবদ্ধ হয়েছিল। অষ্টম শতক থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত সংস্কৃতি, কূটনীতি, বিজ্ঞান ও দর্শনের সর্বজনীন ভাষা ছিল আরবি। ওই সময়ে যারা আরিস্তোতল পড়তে চাইত বা চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক পরিভাষা ব্যবহার করতে চাইত কিংবা গাণিতিক সমস্যার সমাধান খুঁজত অথবা যে কোনো ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় অংশ নিতে চাইত, তাদের জন্য আরবির জ্ঞান ছিল অপরিহার্য।

আরবিভাষা সেমেটীয় গোত্রের ভাষাসমূহের অন্তর্গত একটি ভাষা। অন্যান্য জীবিত সেমিটীয় ভাষাগুলোতে আছে আধুনিক হিবরু ভাষা (ইসরায়েলের ভাষা), আমহারীয় ভাষা (ইথিওপিয়ার ভাষা) এবং ইথিওপিয়ায় প্রচলিত অন্যান্য ভাষা। মৃত সেমিটীয় ভাষাগুলোর মধ্যে আছে ধর্মগ্রন্থ তোরাহ’র প্রাচীন হিবরু ভাষা, আক্কাদীয় ভাষা (ব্যাবিলনীয় ও আসিরীয়), সিরীয় ভাষা  ইথিওপীয় ভাষা।[1]

***

মুসলিমজাতির জীবনপরিক্রমায় আরবিভাষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। মুহাম্মাদ হিদায়াতুল্লাহর ভাষায়–

একজন মুসলমানের জীবনে আরবিভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। কুরআন ও সুন্নাহ আরবিভাষায় বর্ণিত হওয়ায় এর গুরুত্ব সর্বকালে সমান। আরবিভাষা ইসলামি জ্ঞানচর্চা ও মুসলিম সমাজ-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আমিই আরবিভাষায় কুরআন অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমরা উপলব্ধি করতে পারো।’[2]

 

আরবিভাষার চর্চা

 

হিজরি প্রথম শতাব্দীতে আরব-অনারবদের জীবনধারায় সংমিশ্রণ ও আরবিভাষার বিধিবদ্ধ নিয়ম না থাকায় বিশুদ্ধ-আরবি-ভাষা-চর্চা এবং কুরআনের নিগূঢ় রহস্য উপলব্ধি করা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। মূলত তখন থেকে প্রাতিষ্ঠানিক আরবিচর্চা শুরু হয়।

সমাজবিজ্ঞানী আল্লামা ইবনু খালদুন রাহ. সে সময়ের প্রেক্ষাপটের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন

ইসলাম আগমনের পর আরবের অনেকে হিজাজ ছেড়ে অনারবদের সঙ্গে মেলামেশা শুরু করে। ফলে নবাগত আরবদের কথা শুনতে থাকায় প্রকৃত আরবদের শ্রবণশক্তিতে পরিবর্তন ঘটে। অথচ শ্রবণশক্তি ভাষাশেখার অন্যতম একটি উপকরণ। তখন বিজ্ঞজন ভাবলেন, এমন অবস্থা দীর্ঘ হতে থাকলে আরবদের শ্রবণশক্তি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে। এতে কুরআন ও হাদিস বোঝাও কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে তাঁরা নিজেদের যোগ্যতার ওপর নির্ভর করে ভাষা শেখার মূলনীতি প্রণয়ন করেন। বিভিন্ন নিয়ম-নীতির আলোকে ভাষার সব শব্দ ও বাক্যকে অন্তর্ভুক্ত করে নেন।[3]

 

পৃথিবীর যে কোনো ভাষার প্রধানত তিনটি বৈশিষ্ট্য। তা চিন্তাজগতের প্রথম সিঁড়ি, জ্ঞানজগতের আধার এবং যোগাযোগ, ভাষণ-বক্তৃতা ও আবেগ-অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যম। কিন্তু আল্লাহ তাআলা আরবিভাষায় ওহি অবতরণ করায় সব ভাষার মধ্যে আরবি অনন্য মর্যাদার অধিকারী হয়।

 

সুস্পষ্টতায় আরবিভাষা অনন্য

 

আরবিভাষায় সহজে পুরোপুরি সুস্পষ্ট ভাব বর্ণনা করা যায়। আরবিভাষার এ বৈশিষ্ট্যের স্বীকৃতি রয়েছে পবিত্র কুরআনেও। আল্লাহ তাআলা বলেন

সুস্পষ্ট আরবিভাষায় আমি তা অবতীর্ণ করেছি।[4]

এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা আবুল হুসাইন আহমদ ইবনু ফারিস [মৃত্যু ৩৯৫ হি.] বলেন

আল্লাহ তাআলা কুরআনকে বায়ান’ বা সুস্পষ্ট শব্দ দিয়ে অভিহিত করেছেন। এ থেকে বোঝা যায়, অন্য ভাষায় এ বৈশিষ্ট্য নেই এবং মান ও মর্যাদায় আরবিভাষা সব ভাষার চেয়ে শ্রেষ্ঠ।[5]

 

কুরআন ও সুন্নাহ বোঝার প্রধান মাধ্যম

 

কুরআন ও সুন্নাহ বোঝার চাবি হিসেবে আরবিভাষার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। নিগূঢ় রহস্য উদঘাটন ও সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাব উপলব্ধিতে আরবি অদ্বিতীয় মাধ্যম। এ জন্য যুগে যুগে আলিমগণ আরবি শেখার প্রতি উৎসাহ দিয়ে এসেছেন। দ্বিতীয় খলিফা ওমর রা. বলেন

তোমরা আরবিভাষা শেখো। তা তোমাদের দীনের অংশ।[6]

শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ রাহ. বলেন

আল্লাহ তাআলা আরবিভাষায় কুরআন অবতীর্ণ করেছেন। আর প্রিয় নবি সাঃ-কে আরবিভাষায় কুরআন ও সুন্নাহ প্রচারের নির্দেশ দিয়েছেন। দীনের প্রথম অনুসারীগণ ছিলেন আরবিভাষী। তাই দীনের গভীর জ্ঞানার্জনের জন্য এই ভাষা আয়ত্তের কোনো বিকল্প নেই। অতএব, আরবিচর্চা করা দীনেরই অংশ ও দীনের প্রতি শ্রদ্ধার প্রতীক।[7]

 

আরবিভাষায় ইমাম শাফিয়ি রাহ.-এর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। তিনি বলেন

আমাকে ফিকহের কোনো মাসআলা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে আমি নাহুর নিয়ম দিয়ে এর উত্তর দিতাম।[8]

শাফিয়ি রাহ. আরো বলেন

আরবিভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জনের পেছনে আমার প্রধান লক্ষ্য ছিল ফিকহ-চর্চায় বিশেষ মনোযোগী হওয়া।[9]

তিনি আরো বলেন

নাহু বা আরবি ব্যাকরণে গভীর পাণ্ডিত্য লাভ করলে তার জন্য সব ইলম অর্জন সহজ হয়ে যাবে।

 

***

আরবিভাষার মধ্যে আল্লাহ সুবহানাহু বিশাল এক অলৌকিকত্ব গচ্ছিত রেখেছেন। এই ভাষার ইথারে রেখেছেন অনাবিল এক গভীরতা। সাইয়িদ আবুল হাসান আলি নদবি রাহ. তাঁর মুতালায়ে কুরআন কে উসুল ও মাবাদি বইয়ে লেখেন

আল্লাহ কুরআন মাজিদকে আরবিভাষায় কেন অবতীর্ণ করলেন? কারণ, ইসলাম হলো কিয়ামত পর্যন্ত সর্বকালের সার্বজনীন ধর্ম এবং একটি দর্শনসমৃদ্ধ জীবনব্যবস্থা। এখন কিয়ামত অবধি আগত সমস্ত দর্শন, চিন্তা, সবকিছুর মুকাবিলা করতে হবে এই কুরআনের। তাই কুরআনকে এমন সমৃদ্ধ করে অবতীর্ণ করা দরকার যা সর্বকালের সাথে সামঞ্জস্যশীল হবে। আর আরবিভাষা ছিল এর জন্য সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত। কারণ, প্রত্যেক ভাষারই আলাদা কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে গানের সুরের জন্য হিন্দি ভাষা, হামদ-নাতের বেলায় উর্দু ভাষা এবং কাব্যের ক্ষেত্রে ফারসি ভাষার কোনো জুড়ি হয় না। আর আরবিভাষার রয়েছে সমূহ গুণ। অন্যমত কিছু হলো : আল-উমুকিয়্যাহ–গভীরতা, আল-ফালসাফা–দর্শনের ছাপ, আল-উমুমিয়্যাহ–ব্যাপকতা, আস-সিআহ–প্রশস্ততা, আশ-শুমুলিয়্যাহ–অন্তর্ভুক্তিতা এবং আল-জামইয়্যাহ–সর্বমর্ম ধারণ।

ইমাম শাফিয়ি রাহ. বলেন–

عالم العربية جن الإنسان، يرى ما لا يرون.

আরবিভাষার জ্ঞান যারা রাখেন তারা মানুষ জাতের মধ্যে জীন প্রকৃতির বৈশিষ্ট্যধারী; তারা তা দেখতে পায় যা অন্যরা দেখতে পায় না।

 

ইমাম ইবনুল জিন্নি রাহ. বলেন

আরবিভাষার অলৌকিকত্ব আমাকে এ কথা বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছে যে, স্রষ্টা বলতে একজন আছেন।

মুফতি শফি রাহ. তাঁর উসুলুল লুগাহ গ্রন্থে লেখেন

আরবিভাষা হলো আসমানের দফতরি জবান বা কেন্দ্রীয় ভাষা। মানুষের কবর, হাশর, মিজান, জান্নাত, জাহান্নাম, সব জায়গার ভাষা হবে আরবি।

 

***

উপরিউল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো তো আরবি ছিল, কিন্তু ছিল অনেকটা সুপ্ত। ইসলাম সেই সুপ্ত দীপ্তিকে বাহিরের মিনারে এনে বসিয়েছে। শায়খ সাদি আবু হাবিবের ভাষায়–

 

كانت اللغة العربية أيامَ الجاهلية محجوبة الجمال مستورة الكمال، بما ران عليها من غبار الغباوة وكدرة الجهل وظلمة الأُميّة والتخلف الفكري والحضاري، حتى إذا جاء الإسلام والتقتْ بلاغةُ القرآن المجيد، مع فصاحة الرسول ﷺ، تبدلتْ تلك اللغةُ، فغدت نَبْعَ عطاءٍ يهب كلَّ علم يرِدُه مِن سُموّ البيان وإشراق الأحرف وسحر المعاني ما يأخذ بالألباب.

 

আসলো উমাইয়া খিলাফত। তখন আরবিভাষা জোয়ার পেল। আব্বাসি খিলাফতের সময় লাভ করল যৌবনকাল। তাওহিদি-জাহিজগণ ভাষাকে সমৃদ্ধের মণিকোঠায় দাঁড় করান। ক্রমান্বয়ে সমৃদ্ধি ঘটতে ঘটতে আসলো উনিশ শতক। এই শতকে এসে আবুল হাসান আলি নদবি, মানফালুতি, তাহা হুসাইন, আক্কাদ, আহমদ শাওকি, হাফিজ ইবরাহিম, আনওয়ার জুনদি, তাওফিক হাকিম, আহমদ আমিন, ইউসুফ ইদরিস, মুহাম্মাদ হুসাইন হাইকল, নাজিব মাহফুজ, মুসতাফা মাহমুদ, মুসতাফা রাফিয়ি, মুহাম্মাদ গাজালি, সাইয়িদ কুতুব শহিদ, মুসতাফা সিবায়ি, মাহমুদ সাওয়াফ, মাহমুদ শাকির, মাহমুদ মুহাম্মাদ তানাহি, আহমদ তাইমুর পাশা, আহমদ হাসান জাইয়াত, ইবরাহিম মাজিনি, মুসতাফা জাওয়াদ, আমিন খাওলি, আবদুল হালিম উআইস, আয়েশা বিনতুশ শাতি প্রমুখ আরবিভাষায় নতুনত্বের আবে হায়াত প্রবাহিত করেছেন। এখন যদিও সাম্রাজ্যবাদের মতো ইংরেজিকে আন্তর্জাতিক ভাষা বলে মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সমৃদ্ধি, বিশালতা, নৈপু্ণ্য, শৈলরাজ ইত্যাদির ব্যাপক সমাহার ঘটেছে আরবিভাষায়।

 

***

সেই মহান ভাষা কীভাবে রপ্ত করবেন, তার অলি-গলিতে কীভাবে চষে বেড়াবেন, এসবের আলাপ নিয়েই হাজির হয়েছেন এই বইয়ে প্রিয় মাও. আলী আহমদ হাফি. বিভিন্ন দিকের অনবদ্যের সমাহার সাজিয়েছেন তিনি এর প্রতিটি অধ্যায়ে। অনাবিল আসর জমিয়েছেন প্রতিটি পাতায়। আল্লাহ তাঁর এই মেহনতকে কবুলের শীতল চাদরে আবৃত করুন এবং তাঁর ইলম ও আমলে উত্তরোত্তর সুবিস্তৃতি দান করুন।

 

و صلى الله تعالى عليه و على آله و أصحابه أجمعين اكتعين و سلم و بارك عليهم.

 

দুআর মুহতাজ

মুহাম্মাদ আব্দুল কাদির মাসূম

খাদিমুত তাদরীস : জামিয়া মা’ছূমিয়া ইসলামিয়া, মাছিমপুর, সিলেট।

খাদিমুল ফিকহ : জামেয়াতুল খাইর আল ইসলামিয়া, সিলেট

মোবাইল : ০১৭৭৯১৫৮৬২১

তাং– ১১/১০/২০২১ ইং

No comments

Powered by Blogger.