Header Ads

Header ADS

মহাসত্যের বাঁশি: গ্রন্থালোচনা


 ‘মহাসত্যের বাঁশি’: পাঠ শেষে

“এ গৃহে কিছু সম্পদ আছে, যা ধারণ করার জন্য বিশ্বনিখিলও ক্ষুদ্র

এ গৃহের সকল ধূলিকণা এবং খড় হচ্ছে, মৃগনাভী এবং সুগন্ধি
এ গৃহের ছাদ ও দরজা হচ্ছে, ছন্দ এবং সুর
সংক্ষেপে এ গৃহের প্রবেশপথ যে পেয়েছে
সে বিশ্বের রাজা এবং কালের মহাজন। ”
উপরের কথাগুলো রুমী’র। বাংলায় যিনি নিয়ে এসেছেন তিনিও এ জগতের বাসিন্দা। তিনি ‘বিজয়ের সন্তান’। তাঁর তুলির টানে জীবন্ত হচ্ছে ‘দুই হাতে সূর্য’ । তিনি ‘মহাকাব্যের কোকিল’র গান শুনান। বাজান ‘মহাসত্যের বাঁশি’। কালের মঞ্চে হাজির করেন ‘মরমী মহারাজ’কে। জমাতে শুরু করেছেন ‘মহাকালের মধু’। যাঁর ভেতরে বাস করে গবেষণা ও দার্শনিকতায় ডুবন্ত সত্তা।
তিনি ধারণ করেন সেই চেতনা, যে জাগলে ‘কবরের মাটি ঝেড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে জাগে জীবন্ত প্রোথিত সব শিশু।’ যে ছুটলে ‘ইতিহাসের নোনাজলে ডুবে যায় সাম্রাজ্যবাদ আর কবিতার বারটি পঙক্তির উপর দিয়ে বাঁধার সমুদ্র পার হয় মানুষের মহাস্বাধীনতা।’ যে ফুটলে ‘সূর্যের আয়াতগুলো আযানের ঝংকারে হাসির দানার মতো ছড়িয়ে পড়ে প্রকৃতির প্রাণে।’
কে তিনি? তিনি স্বীকৃত বোদ্ধা ও অসুন্দরের বিরুদ্ধে নির্ভিক যোদ্ধা। তিনি ‘কুয়োতে সাগরদর্শী’ কবি মুসা আল হাফিজ।
সম্প্রতি ২০১৬ এর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হলো তাঁর ‘মহাসত্যের বাঁশি’। বাঁশিটা যখন হাতে পেয়ে বাজাতে শুরু করলাম, দেখলাম যে সুর ছড়াচ্ছে তা শুধু পার্থিব নয় অপার্থিবও। যে ঝংকার আসছে তা যেমন লৌকিক তেমনি অলৌকিক। সে সুর আপনার কানেও একবার বাজুক-
“হাঁটতে হাঁটতে সবক’টা ক্ষুধার্ত গ্রহ পেরিয়ে এলেন কবি। রক্তের ভেতর একসাথে গর্জন করছে শুরু ও সমাপ্তি। চারদিকে অপার্থিব সৌন্দর্য রঙিন মেঘের মতো ভাসছে। কিন্তু সকল সৌন্দর্যকে পেঁচিয়ে বৈদ্যুতিক অক্ষরে রচিত হচ্ছে পিপাসার বিবৃতি।
কার পিপাসা?
পরমের পিপাসা।”
“প্রগাঢ় এক ঘূর্ণিঘোরে বোধগুলো উড়ছে, ঘুরছে। আকাশ মথিত করছে অজানা সুরের প্রবাহ। সময়ের মর্মরে গভীর আর্তির মতো প্রবল এক তিয়াস।
কার তিয়াস?
পরমের তিয়াস।”
কে সেই পরম? জানতে হলে আমাদেরকে ভ্রমণ করতে হবে রুমীর জীবনের অলি গলিতে। তাঁর সাথে কাল যাপন করতে হবে সরাইখানায়। কারণ রুমীর আদ্যন্ত্য জীবন হচ্ছে এই পরমের নির্ভুল অনুসন্ধান। আর এই অনুসন্ধানের পথ ও পাথেয়কে বানান করে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে ‘মহাসত্যের বাঁশি’তে। মহাকবি জালালুদ্দীন রুমী (রহ.) এক রহস্যের নাম। সে রহস্য উদঘাটন সুকঠিন। যারা করতে পেরেছে তারা প্রেম সমুদ্রে ডুব দিয়েছে। বোধের গহীনে তারা লুপ্ত হয়েছে। সুরের মিষ্টি আগুনে দগ্ধ হয়েছে তাদের ভেতর ও বাহির, তাদের আদি ও অন্ত্। তারা হয়েছে আলোর রাজ্যের নাগরিক। প্রশ্ন ও উত্তরের মধ্য দিয়ে লেখক রুমী’র রহস্য উদঘাটন করেছেন। সে প্রশ্নোত্তরে প্রশ্নকারী প্রেমিকের প্রতীকে কবি মুসা আল হাফিজ আর উত্তর দেন রুমী। উদাহরণ দিচ্ছি-
“প্রেমিক- পোষাক পরিহিত মানুষ সম্পর্কে আপনার অভিজ্ঞতা কী?
রুমী- অনেক মানুষ দেখেছি, যাদের পরণে পোষাক ছিল না ।আবার অনেককে দেখেছি যাদের পরণে পোষাক ছিলো। কিন্তু ভেতরে মানুষ ছিল না।
প্রেমিক-আমাদের আসলে কী বদলানো উচিত?
রুমী-নিজেকে। চালাক মানুষ নিজেকে ছাড়া সবকিছু বদলাতে চায়। যখন আমি অপরিপক্ব ছিলাম,অন্যকে বদলাতে চাইতাম। যখন জ্ঞানী হলাম, নিজেকে বদলাবার চেষ্টা করছি।
প্রেমিক-অনুভব কখন পূর্ণ হয়?
রুমী-যখন সে না লেখা কবিতার স্থান পূর্ণ করে।
প্রেমিক-যে কবিতা লিখিত হবে না সেটা কী?
রুমী-তোমার চোখের পাতা আমার হৃদয়ে যে কবিতা লিখবে, সে কবিতা কোনো কবির কলম থেকে বের হবে না কোনোদিন।
প্রেমিক- আমার ভেতরে কিসের তাড়া?
রুমী- তোমার ভেতরে তাড়া করছে একটি সকাল। উজ্জ্বল আলো বিস্ফোরিত হবে বলে।
প্রেমিক- কীসে পরিচ্ছন্ন হবো?
রুমী- গলে যাওয়া বরফের মতো হয়ে যাও। নিজকে দিয়ে নিজেকে ধুয়ে ফেলো। পরিচ্ছন্ন হবে।
প্রেমিক- মুক্তির পথ বড় ক্লান্তিকর!
রুমী- ক্লান্তির কারণ পথ নয়, তোমার চলা। তুমি জন্মেছিলে দু’টি ডানা নিয়ে। তবে কেন জীবনভর হামাগুড়ি দিতেই তোমার এত পছন্দ?”
এভাবে প্রশ্নের জালে ফেলে সুকৌশলে রুমীর ভেতরকে পাঠকের সামনে পেশ করা হয়েছে বইটিতে। বাংলা গদ্য-সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র এয়াকুব আলী চৌধুরী, যাযাবর ও মুহম্মদ ওয়াজেদ আলী’র রচনাধারা একদা যে মুগ্ধতা এনেছিলো, আমরা তারই নতুন রুপ দেখি এই গ্রন্থে । গদ্যের মধ্যে কাব্যের স্বাদ ও্ আন্তরিক যে মাধুর্য এয়াকুব আলীতে, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন সব্যসাচী লেখক, সাহিত্যের মহিরুহ আবদুল মান্নান সৈয়দ । কবি মুসা আল হাফিজের বিশ্লেষণের জন্য প্রয়োজন সৈয়দের সেই দৃষ্টি। যা দিয়ে বিচার করলে পরিস্কার হতো মুসা আল হাফিজের রচনাশৈলীর কৃতিত্ব। গদ্যের প্রতাপ ও অলংকার এর কয়েকটি উদাহরণ টেনেই ইতির দিকে মোড় নেব। লক্ষ্য করুন-
(১)
“জিজ্ঞাসাটি চারদিকে সহসা কেঁপে কেঁপে উঠছে। নিঠুরতায়, নিবিড়তায় শিহরিত হচ্ছে। ব্যকুলতায়, বিপুলতায় উজ্জীবিত হচ্ছে । মধুরতায়, অধিরতায় উচ্ছলিত হচ্ছে। আছড়ে পড়ছে পুলকে পুলকে । মুখরিত হচ্ছে আগুনে ফাগুনে। প্রসারিত হচ্ছে মলয়ে প্রলয়ে।
(২)
স্বাগতম! সর্যোদয়!! জীবন এবার হাসো। সাধনার কেন্দ্রভূমি এখন পরিস্কার। অভিযাত্রা এখন মোহনা খুঁজে পেয়েছে। সে মোহনায় প্রেম। মধুরম মনোহর। সে মোহনায় গভীর আমোঘ মহিমা। স্নিগ্ধ মোহন অসীমা। তাকে আজি শত বর্ণে, শত স্বর্ণে সাজাতে হবে। শত ছন্দে, শত সংঙ্গীতে বাজাতে হবে। শত রন্দ্রে, শত মন্দ্রে নাচাতে হবে। সে ব্যপ্ত হোক নীড়ে নীড়ে। সে প্রসারিত হোক ধীরে ধীরে। সে বিস্তারিত হোক সুধায় বসুধায়।
(৩)
কখনো স্বচ্ছ আনন্দের অশ্রুধৌত জ্যোতি। কখনো রহস্যের পল্লবে তরঙ্গিত হাসি। সর্বত্রই অঙ্কুরিত হচ্ছে চারুতা। মুকুলিত হচ্ছে প্রিয়তা। মুঞ্জরিত হচ্ছে মুগ্ধতা। গুঞ্জরিত হচ্ছে সুর। উচ্ছসিত হচ্ছে প্রাণ। চিত্ত প্রবাহিত হচ্ছে ভাবস্রোতে। ভাবস্রোত মিলিত হচ্ছে কবিতার মোহনায়।
(৪)
নবুওতের উৎস থেকে বহমান ইসলামের প্রাণশক্তি এ পরিস্থিতিকে বরদাশত করবে কেন? ইসলামের আত্মা থেকে বেরিয়ে এলো নতুন এক অমীয় প্রবাহ। হৃদয়ের দহনে সে তপ্ত। প্রেমের শরবতে সে সিক্ত। সুন্দরের সৌরভে সে স্নিগ্ধ। পবিত্রতার মাহাত্মে সে শুদ্ধ। মোহনীয় ঐশ্বর্যে সে ঋদ্ধ। সত্যের বিভায় সে প্রবুদ্ধ। ”
এভাবে ক’টি উদাহরণ টানবো আর? তাহলে যে বই’র অর্ধেকের চেয়ে বেশিকেই উপস্থাপন করতে হবে। তারচে’ আপনিই বরং একবার ঘুরে আসুন। আর নিজেকে হারান ছন্দের মাদকতায়, ভাবের অতলতায়।
বই’র ১৫৫ নং পৃষ্টা থেকে পাঠকের জন্য রয়েছে আরেক আকর্ষণ। রুমী’র বাছাইকৃত কবিতার অনুবাদ। কবিতাগুলোকে অনুবাদ না বলে যদি মৌলিক বলি মোটেও অত্যুক্তি হবে না। পাঠককে ‘মহাসত্যের বাঁশির’ ভূবনে আমন্ত্রণ।

No comments

Powered by Blogger.