কাশ্মীর; এলোমেলো বাতচিত
কাশ্মীর; এলোমেলো বাতচিত
হুসাইন আল হাফিজ
.
‘ডাকছে কৃষ্ণপক্ষের–রাত ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?
লুট হয়ে গেল ইতিহাস, স্মৃতি, পতাকা কৃষ্ণচূড়া—
চেতনায় জ্বলে বৈরী আগুন– ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?’
.
‘বিশ্বমিডিয়া’ শব্দটা কানে বাজলেই মনে পড়ে রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ–র উপরোক্ত লাইনগুলো। কেন, জানি না। মনে পড়ে তো মনে পড়েই, চোখের পাতায় ভেসে ওঠে ওদের কুকীর্তি, বাঞ্চালি। কী না করতে পারছে ওরা। কিন্তু আমরা? বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে যখন সময়ের স্রোত বয়ে যাচ্ছে, একজন মানুষের চিন্তা ‘সুন্দর নাকি অসুন্দর’ এই প্রশ্ন উপেক্ষা করে যখন নিছক বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা–ই বিশ্বমিডিয়ার দরবারে হয়ে উঠেছে মানুষের একমাত্র পরিচয়, আমরা তখন উদাসীনতার কম্বলে গা মুড়িয়ে ঘুমোচ্ছি। আমাদের মিডিয়া নেই, এটা নেই—ওটা নেই বলে বলে মানসিকভাবে ঝিমিয়ে পড়েছি। অথচ চিন্তার প্রখরতা যে শুধু মিডিয়া নয়, বিশ্বমিডিয়াকেও মাথা ঝুঁকাতে বাধ্য করে, এর বাস্তব চিত্র আমরা আশপাশে দেখি, জানি, শুধু বুঝি না— বুঝতে চাইছি না।
.
কাশ্মীর বলতেই দাদারা জানেন– ‘তুমি তো মুসলমান’। আর মুসলমান মানেই ওদের গোশত কুচি কুচি করে কুকুরের পাতে তুলে দাও, মারো, ধরো, জ্বালাও, পোড়াও। হ্যাঁ, কাশ্মীর জ্বলছে, কাশ্মীরকে জ্বালানো হচ্ছে। দশ, বিশ কিম্বা ত্রিশ নয়, বাহাত্তর বছর ধরে কাশ্মীর জ্বলছে। দুনিয়ার স্বর্গ খ্যাত এ দেশটায় রোজ রোজ পুড়ে মরছে তানিমের মত কত শিশু, ঝোপ–ঝাঁড়ে কিম্বা খোলা ময়দানে ধর্ষিত হচ্ছে আমেনার মত কত শত মা আর রুবাইয়ার মত কত বোন, তা বেহিসাব। জ্বলছে তো জ্বলছে, এ আগুন নেভে না। সুকান্ত ভট্টাচার্য্য লিখেছিলেন—
‘সেই বিশ্রী দম–আটকানো কুয়াশা আর নেই
নেই সেই একটানা তুষার–বৃষ্টি,
হঠাৎ জেগে উঠেছে—
সূর্যের ছোঁয়ায় চমকে উঠেছে ভূস্বর্গ।
দু–হাতে তুষারের পর্দা সরিয়ে ফেলে
মুঠো মুঠো হলদে পাতাকে দিয়েছে উড়িয়ে,
ডেকেছে রৌদ্রকে।
ডেকেছে তুষার–উড়িয়ে–নেওয়া বৈশাখী ঝড়কে,
পৃথিবীর নন্দন–কানন কাশ্মীর।’
.
হ্যাঁ, কাশ্মীর মানেই ভূস্বর্গ, কাশ্মীর মানেই পৃথিবীর নন্দন–কানন। বিশ্বে সামরিকভাবে ব্যাপক গুরুত্ব পাওয়া অঞ্চলগুলোর একটি কাশ্মীর এবং একই সাথে ভারত ও পাকিস্তানের মতো দু–টি পারমাণবিক শক্তিসম্পন্ন দেশের সবচেয়ে অস্থিতিশীল সীমান্তবর্তী এলাকা। কাশ্মীর আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত না হলেও কখনোই ঠিক ‘ভারতীয়’ ছিল না। ভূ-প্রকৃতি, ঐতিহ্য, জনতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যে অঞ্চলটি ভারত থেকে একেবারেই আলাদা। এতো ইতিহাস টানা–হেচড়া না করলাম, সংক্ষেপে এতটুকু জেনে রাখুন। পঞ্চম শতাব্দীর আগে কাশ্মীর প্রথমে হিন্দুধর্ম এবং পরে বৌদ্ধধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। নবম শতাব্দীতে কাশ্মীরে শৈব মতবাদের উত্থান ঘটে। ত্রয়োদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীতে কাশ্মীরে ইসলাম ধর্মের বিস্তার ঘটে এবং শৈব মতবাদের প্রভাব হ্রাস পায়। কিন্তু তাতে পূর্ববর্তী সভ্যতাগুলোর অর্জনসমূহ হারিয়ে যায়নি, বরং নবাগত ইসলামি রাজনীতি ও সংস্কৃতি এগুলোকে বহুলাংশে অঙ্গীভূত করে নেয়, যার ফলে জন্ম হয় কাশ্মীরি সুফিবাদের।
.
১৩৩৯ সালে শাহ মীর কাশ্মীরের প্রথম মুসলিম শাসক হিসেবে অধিষ্ঠিত হন এবং শাহ মীর রাজবংশের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তী পাঁচ শতাব্দীব্যাপী কাশ্মীরে মুসলিম শাসন বজায় ছিল। এর মধ্যে মোঘল সম্রাটরা ১৫৮৬ সাল থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত এবং আফগান দুররানী সম্রাটরা ১৭৪৭ সাল থেকে ১৮১৯ সাল পর্যন্ত কাশ্মীর শাসন করেন। ১৮১৯ সালে রঞ্জিত সিংহের নেতৃত্বে শিখরা কাশ্মীর দখল করে। ১৮৪৬ সালে প্রথম ইঙ্গ—শিখ যুদ্ধে ইংরেজদের নিকট শিখরা পরাজিত হয়। এরপর অমৃতসর চুক্তি অনুসারে জম্মুর রাজা গুলাব সিংহ অঞ্চলটি ব্রিটিশদের কাছে থেকে ক্রয় করেন এবং কাশ্মীরের নতুন শাসক হন। ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তাঁর বংশধরগণ ব্রিটিশ রাজমুকুটের অনুগত শাসক হিসেবে কাশ্মীর শাসন করেন। ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে পাকিস্তান আর ভারত স্বাধীনতা পাবার আগে থেকেই কাশ্মীর বিতর্কের কেন্দ্রে। কাশ্মীরের অংশবিশেষ ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশ নিয়ন্ত্রণ করে। একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ চীনের।
.
১৯৪৭, ১৯৬৫ এবং ১৯৯৯–এ অন্তত; তিনটি যুদ্ধ হয়েছে। যুদ্ধগুলো পাকিস্তান এবং ভারত দুই দেশের মধ্যেই ঘটে। কাশ্মীর ভারতীয় হতে চায় না, যেমন কখনো চায় নি—এখন চায় না পাকিস্তানি হতেও, কেননা তা সম্ভব নয়। আবহমানকালের স্বাধীন রাজ্য কাশ্মীর এখন চায় স্বাধীন রাষ্ট্র হতে। কাশ্মীরি বিদ্রোহীরা এবং ভারত সরকারের মধ্যে বিরোধের মূল বিষয়টি হল স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন। কাশ্মীরের গণতান্ত্রিক উন্নয়ন ১৯৭০–এর শেষভাগ পর্যন্ত ছিল সীমিত এবং ১৯৮৮ সালের মধ্যে ভারত সরকার কর্তৃক প্রদত্ত বহু গণতান্ত্রিক সংস্কার বাতিল হয়ে গিয়েছিল । অহিংস পথে অসন্তোষ জ্ঞাপন করার আর কোনো রাস্তাই খোলা ছিল না তাই ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য বিদ্রোহীদের হিংসাত্মক আন্দোলনের সমর্থন নাটকীয়ভাবে বাড়তে থাকে। ১৯৮৭ সালে বিতর্কিত বিধানসভা নির্বাচন রাজ্যের বিধানসভার কিছু সদস্যদের সশস্ত্র বিদ্রোহীগোষ্ঠী গঠনে অনুঘটকের কাজ করেছিল। ১৯৮৮ সালের জুলাই মাসে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল, ধর্মঘট এবং আক্রমণের মাধ্যমে শুরু হয় কাশ্মীরের অস্থিরতা।
.
জল থাকলে জল গড়ায়, আগুন লাগলে ছড়ায়। এই যে ১৪ ই ফেব্রুয়ারি সম্প্রতি পুলাওয়ামা ঘটনাকে কেন্দ্র করে কাশ্মীরে আবারো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এক তথ্যমতে— এটি ভারতীয় বাহিনীর উপর হওয়া সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী আক্রমণ ছিল, যেখানে কয়েক দফা বোমা বিস্ফোরণে এবং গোলাগুলিতে প্রায় ৫০ জনের মত নিহত হয়েছে। ভারত অধ্যূষিত কাশ্মীরে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সংঘাতের কারণে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষও মারা গিয়েছে গত বছর; ২০১৮ সালে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, বেসামরিক ব্যক্তি এবং জঙ্গীগোষ্ঠীর সদস্যসহ কাশ্মীরে ৫০০ জনের বেশি নিহত হয়েছে। ১৯৫০—এর দশক থেকে জাতিসংঘ বলে আসছে, কাশ্মীর ইস্যুতে ঐ এলাকার মানুষের মতকে প্রাধান্য দেয়ার লক্ষ্যে একটি গণভোট আয়োজন করা উচিত।
.
জাতিসংঘের বলা উপরোক্ত পরিকল্পনাকে ভারত শুরুতে সমর্থন করলেও পরবর্তীতে তারা বলে যে গণভোট আয়োজন প্রয়োজনহীন; কারণ ভারত অধ্যূষিত জম্মু ও কাশ্মীরের নির্বাচনে সেখানকার মানুষ ভারতের সাথে থাকার পক্ষেই মত দেবে। কিন্তু পাকিস্তান এই দাবি সমর্থন করে না। তাদের বক্তব্য, ভারত অধ্যূষিত কাশ্মীরের অনেক মানুষই ভারতের সাথে থাকতে চায় না; তারা হয় স্বাধীনতা চায়, নয়তো পাকিস্তানের সাথে যোগ দেয়ার পক্ষপাতী। ভারত অধ্যূষিত জম্মু ও কাশ্মীরের জনসংখ্যার ৬০ ভাগের বেশি মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। এটিই ভারতের একমাত্র রাজ্য যেখানে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যাগুরু।
.
এই মহাসঙ্কটে সমাধান তাহলে কী? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলে যাওয়া কথাটা একটু কানে বাজান তো— ‘পাকিস্তান ও ভারত সামরিক খাতে অর্থ ব্যয় না করে দুই দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য অর্থ ব্যয় করতে পারত। দু–দেশের জনগণও উপকৃত হত। ভারত যখন গণতন্ত্রের পূজারি বলে নিজকে মনে করে, তখন কাশ্মীরের জনগণের মতামত নিতে কেন আপত্তি করছে? এতে একদিন দুটি দেশ–ই এক ভয়াবহ বিপদের সম্মুখীন হতে বাধ্য হবে।’
.
শেষ করার আগে বলি, বঙ্গবন্ধু বলে গেছেন বলেই নয়— বর্তমান পরিস্থিতিও এ সাক্ষ্য বহন করে, কাশ্মীরকে এই যে তিন দিক থেকে টানছে তিনটি পরমাণু শক্তিধর দেশ। এ টানাটানি এদেরকে আবারও হেচড়ে নামাতে পারে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দিকে। উপায় তাহলে কী? উপায়ান্তর হিসেবে যদিও বিজ্ঞমহাশয়রা ‘কাশ্মীর সমস্যা’ সমাধানের নানা ফর্মূলা উপস্থাপন করেছেন, কিন্তু শেষপর্যন্ত একইরকম আরেকটি প্রশ্ন আমাদের ভাবায়— কাশ্মীর এতো গুরুত্বপূর্ণ কেন?


No comments