Header Ads

Header ADS

অসুস্থতা ও আমার মা

আমার অসুস্থতা ও মা...

 

মাস খানেক আগে হাড়মজ্জা কাঁপিয়ে জ্বর এসেছিল। বিছানা আর আমি, আমি এবং বিছানা একাকার ছিলাম সপ্তাহব্যাপী। নরকযন্ত্রণার সাথে কোনোকিছুর তুলনা করা সম্ভব হলে আমি জ্বরযন্ত্রণাকেই বলতাম নরকযন্ত্রণা। আমার বড়বোন, স্ত্রী সকলেই বিরতিহীন সেবা করেও জ্বরের কোনো কিনারা করতে পারেননি। অবশেষে বয়েসী, মায়াঝরঝর আমার মা যখন আমারই কষ্ট দেখতে দেখতে সইতে পারলেন না তখন সবাইকে ছুটি দিয়ে নিজেই নিলেন আমার দায়িত্ব। পরদিনই আমি সেরে ওঠলাম।

মাদরাসায় গেলাম। দিব্যি দিনকাল কাটছিল। ছাত্রদের আনাগোনা আর হৈহল্লায় এক এক করে চার সপ্তাহ কাটার পর বিশেষ প্রয়োজনে বাড়ি আসলাম গেল বৃহস্পতিবার।

দিন কাটল, রাত পোহালে সূর্য হাসল আমাদের পূবদিকের গ্রাম খলাছড়ার সারি সারি সাজানো বাড়িগুলোর সৌন্দর্য সুপারিগাছের ফাঁকে।

চমৎকারভাবে সূচিত এই দিন জুমুআর নামাজের পর থেকে কেমন গুমোট গুমোট লাগছিল। আমি কিছু বোঝে ওঠতে না পেরে মাকে জানালাম বিষয়টা। তিনি সস্নেহ পরামর্শ দিলেন, ডাক্তারের কাছে গিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নাও; এবারের জ্বর বড়ো মারাত্মক। যাকেই ধরছে তাকেই কাত করে দিচ্ছে।

ওষুধ আনতে আমি বাজারে এখনো যাইনি। বাড়িতে মিস্তিরি কাজ করছে। সন্ধ্যা নামার আগে আমার ছোটোমামা মারুফকে সাথে আমাদের বাড়িতে আসলেন। একটা হিসাব করার জন্য মামার নির্দেশে খাতাকলম নিয়ে বসলাম। ঠিক তখন থেকেই আমি বুঝতে পারি আমার অবস্থা নিয়ন্ত্রণক্ষমতাকে টপকাচ্ছে। আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, যে জ্বর মাত্র একমাস আগে আমাকে ধরাশায়ী করে গেল সেই জ্বর আবার কেন এতো পরাক্রম আর প্রতাপ নিয়ে আমাকে ঝাপটে ধরছে।

কবি ও গীতিকার প্রিয়জন হুসাইন আল হাফিজের দুটো বই পৌঁছাতে হবে। তাঁকে অনুরোধ করলাম ঈদগাহ বাজার থেকে নিয়ে যেতে। তিনি আমার কথা রাখলেন। তাঁর বই নিয়ে এবং আমার ওষুধের জন্য বাজারে গেলাম। ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ কেনার পর হুসাইন সাহেবের জন্য যে পাঁচদশ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়েছে সেটার অভিজ্ঞতা ছিল আরবি প্রবাদ

الانتظار أشد من الموت

অপেক্ষা মৃত্যুর চেয়ে কঠিনতর-এর মতো। অথচ আমরা একে অপরের জন্য অপেক্ষা করাকে উপভোগ করি; কিন্তু আজ ব্যাপারটা সম্পূর্ণ উলটো।

হুসাইন সাহেব ঈদগাহ বাজার এসেছেন হিসেবে নিশ্চয় তিনি আমার মেহমান। তাঁকে চা-পান, ঠান্ডা ইত্যাদি আপ্যায়নের দায়িত্ব যেখানে আমার সেখানে তিনিই বারবার আমাকে এসবের জন্য সাধলেন। আমি তাঁকে আবারো অনুরোধ করে দ্রুত বাড়ি ফিরলাম। বিছানায় পড়লাম। শুক্রবার রাত, শনিবার, রোববার বিছানা থেকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া আর উঠা হয়নি; উঠতে পারিনি।

যে ওষুধ আমি নিয়ে এসেছিলাম তা শেষ হলো। আব্বা ওষুধ আনলেন, কাজ হলো না। অত্যল্পকাল আরাম বোধ করি ফের ফিরে যাই বিছানায়। এভাবেই কাটছে সময়।

সকালে শরীরকে একটু হালকা মনে হলো। মাকে বললাম, চারদিন হয়ে গেল মাদরাসায় যাই না। কেমন কেমন লাগে। আজ বরং চলেই যাই। মা বললেন, না। সারাদিন থাকো তারপর বিকেলে শরীর সায় দিলে যেয়ো। এ কথা বলেই হালকা গরম পানির ব্যবস্থা করে পুরো গা মুছলেন প্রায় তিরিশ মিনিট ধরে। এখন জামাকাপড় পালটিয়ে আমি পূর্ণ সুস্থ মানুষ।

আমি বিবাহিত এক পুরুষ। ঘরে আমার মায়াবতী স্ত্রী আছেন। শুধু আমি কেন, আমার বড়ো দুই ভাই। তাঁদের ঘরে ফুটফুটে সন্তানাদিও আছে। কিন্তু আমরা যখনই অসহায়ত্ব বোধ করি মা সেটা বোঝে নেন। সন্ধ্যেসকাল আমাদের পাশে থাকেন, দুআ করেন, অভয় দেন। আমরাও মায়ের কাছে ফিরে যাই। মায়ের কাছে ফিরতে হয় আমাদের। আমরা পুরুষ হই, মা মা-ই থাকেন। আমরা বাবা হই, মা মা-ই থাকেন। আমরা বুড়ো হই, মা মা-ই থাকেন। মা। আমাদের মা।

#টুকে_রাখি

০৪/১০/২১ 

No comments

Powered by Blogger.