Header Ads

Header ADS

সৃষ্টির জয়োল্লাস...হৃদয়ের অনুবাদ


 সৃষ্টির জয়োল্লাস...হৃদয়ের অনুবাদ

যদ্দুর মনে পড়ে সময়টা ছিলো ২০০৩
সাল। মাদারখাল (কবির গ্রামের
নাম) স্কুল থেকে প্রকাশিত একটি
স্মারকে তাঁর ‘ভালোবাসা’ শিরোনামের কবিতাটি আমি প্রথম
পাঠ করি। না নিজেকে, না
নারীকে বুঝা ঐ শাবক বয়সের আমি
তখন হৃদয়ে বয়ে যাওয়া একটা
বানের আওয়াজ শুনলাম। সে বান
কিসের বান? ভালোবাসার বান। সে বান কিসের বান? উছলে উঠা
প্রেমের বান। আমাদের জাতীয়
কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন-
“নারীর বিরহে নারীর মিলনে নর
পেল কবি প্রাণ
যত কথা তার হইল কবিতা শব্দ হইল গান।”
যার ভেতর-সত্তায় স্ফটিকস্বচ্ছ
প্রেম নেই, সে কবি হতে পারে না।
যার হৃদয়-নদীতে নারী মুক্তমনে
সাঁতার কাটতে পারে না, সে কবি
হতে পারে না। কবিরা প্রেমিক হয়। কবিরা প্রেম দিতে জানে,
প্রেম নিতে জানে।
‘সৃষ্টির জয়োল্লাসে রাঙাই
নিজেকে’ কাব্যগ্রন্থের জনক কবি
এম এ ফাত্তাহ। আমরা তাঁকে
একসাথে প্রেমিক কবি, মরমী কবি, নৈসর্গিক কবি, মুক্তমনা কবি
ইত্যাদি অভিধায় ভূষিত না করলে
তাঁর সৃষ্টিশীল মেধার উপর
অবিচার করা হবে। চরম বে-
ইনসাফি ও নির্জলা অন্যায় হবে।
তিনি যে সার্বিক ও সার্বজনীন কবি তার ভূরি ভূরি প্রমাণ মিলে
তাঁরই কাব্যগ্রন্থ ‘সৃষ্টির
জয়োল্লাসে রাঙাই নিজেকে’র
পাতায় পাতায়, কবিতায় কবিতায়।
পাঠক লক্ষ্য করবেন তাঁর কবিতার
পট ও প্লট, চিন্তাচারণ ও চিত্রকল্প একদম তাঁর নিজের
তৈরী। নিজের সৃষ্টি। তাঁর উপমা,
তাঁর বাক্যবন্ধন, তাঁর সুচিন্তিত
শব্দচয়ন একান্ত নিজস্ব ভাঁড়ার
থেকে আমদানীকৃত। অন্যের ভাব ও
প্রভাব, ছাঁচ ও ধাঁচ ম্যাগনিফায়িং গ্লাস দিয়েও খুঁজে পাওয়া সুকঠিন।
এই মুহূর্তে মনে পড়ছে জর্জিও দ্য
চিরিকো’র কথা। তিনি বলেন-
‘সত্যিকার জ্ঞানগভীর ছবি শিল্পি
আঁকবেন সত্তার গভীরতম তলদেশ
থেকে। সেখানে থাকবে না ঝর্ণার কলস্বর, পাখির গান কিংবা পাতার
মর্মর।’ আমরা দেখতে পাই কবি এম
এ ফাত্তাহ পাঠকের জন্য ছবি
এঁকেছেন সত্তার গভীরতর তলদেশ
থেকে। সেখানে ঝর্ণার কলস্বর
আছে বটে কিন্তু সেটা তাঁর নিজস্ব জগতের। সেখানে পাখির গান আছে,
পাতার মর্মর আছে কিন্তু তা তাঁর
রেজিস্ট্রি করা একান্ত ব্যক্তিগত
ভূবনের। সেখানে ভ্রমণ করতে
লাগে তাঁর সীলমোহর করা
পাসপোর্ট ও ভিসার। কবি এম এ ফাত্তাহ মূলত প্রেমিক।
আমি প্রবলভাবে বিশ্বাস করি,
প্রেমই তাঁকে নিয়ে এসেছে
কবিতার সুবিশাল বন্দরে। কেবল
প্রেমই তাঁর আত্মার বীজতলায় রুয়ে
দিয়েছে কবিতার শস্যদানা। তাঁর সেই প্রেম, তাঁর মননের পরতে
পরতে মিশে যাওয়া প্রেম আমরা
প্রত্যক্ষ করি ‘সৃষ্টির জয়োল্লাসে
রাঙাই নিজেকে’র অধিকাংশ
কবিতায়। লক্ষ্য করুন-
‘এত প্রেম কীভাবে জমে প্রেমহীন রুদ্র রুক্ষ বুকে
এত ভালোবাসা কীভাবে জাগে
ফরমালিন ভালোবাসার যুগে
এত টান কিসের আহবান যেন
পাপিয়ার গান
ধ্বংসবীণা নাকি পুঞ্জিভূত প্রেম চেয়েছো যারে আপন করিবারে
জীবন্ত দুর্বিনীত যে প্রেম
ছোঁয়া যায় না যারে, আপন
করিবারে
মন মনকে টানে, হৃদাকাশ নীলিমায়
নামে , ছুঁয়ে যায় তারে দূর অজানায়
কোন্ সুদূর ঠিকানায়।’
-মরমে এ প্রেম জাগে,পৃ-১৮
কেমন করে তিনি মনের মানুষকে
চান? আমরা এ প্রশ্নের উত্তর
জানতে পারি তাঁর ‘মনের আকরে’ কবিতার প্রথম স্তবক থেকে। তিনি
বলেন-
‘পাথরে খোদাই করে লেখো নাম
বলব না
মনের আকরে লিখো, সযতনে রেখো
এই আমায় পরম মধুমাখা মমতায় যেখানে নেই কারো বসবাস
আমি ছাড়া আর কারো আবাস।’
-মনের আকরে,পৃ-১৯
তাঁর প্রেম, তাঁর ভালোবাসা সসীম
না। তাঁর প্রেম, তাঁর ভালোবাসা
অসীম। তিনি শুধু নারীতে ও নিজেতে সীমাবদ্ধ নন। ‘একেকটা
প্রসব একেকটা পৃথিবী তা-কি ওরা
জানে?’ এমন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে
তিনি ধিক্কারের ট্যাঙ্কলরি
চালান ‘রাজন’ হত্যাকারীদের
বুকের পাজরে। তাঁর ধিক্কারের ভাষা-
‘ঠাট্টা আর অট্টহাসিতে বুনো পশুরা
ফুটনোন্মুখ
পুষ্পদানাকে অংকুরে বিনাশ করে
দিলো,
ঐ চন্দ্রমুখ সুন্দর এ ধরাকে সৃষ্টিশীল কিছু
উপহার দিতো নিশ্চয়ই;
সৃষ্টির মাহাত্ব আর মর্যাদা ওরা
কী বুঝবে,
একেকটা প্রসব একেকটা পৃথিবী
তা-কি ওরা জানে, তা-কি তারা মানে, কুলাঙ্গারের
হাড্ডি
গণধিকৃত খুনিরা ওই।’
-রাজন বেঁচে থাকবে
স্বমহিমায়,পৃ-২১
কবি এম এ ফাত্তাহ স্মৃতিমন্থনে ডুব দেন। তিনি তাঁর প্রয়াত বাবার
কাছে, মায়ের কাছে সত্তার
বিনিময়ে খুঁজে ফেরেন
ফরমালিনমুক্ত ভালোবাসা। তিনি
স্মৃতি হাতড়ান, যেমন জাত-কবিরা
স্মৃতি হাতড়ায়- ‘বড় বেশি অসহ্য লাগে বাবা-
জগতের মেকি প্রেম আর ধামাধরা
স্বার্থান্বেষী
ঐ চামচার দল যখন অকারণে
প্রশংসার ফাঁকা বুলি
আওড়িয়ে মন ও মগজকে বিষিয়ে তুলে,
স্মৃতি হাতড়িয়ে খুঁজি
ঘুমালাম কিনা মশায় বিরক্ত করছে
কিনা
নাকি রাত জেগে চুপিসারে
বই হাতে মূল্যবান নিদ্রার যবনিকা টানছি
সন্তর্পণে অতি সন্তর্পণে
তুমি শিয়রে এসে মাথায় হাত
বুলিয়ে দেখে যেতে।’
-খুব বেশি মনে পড়ে বাবা,পৃ-২৬
আলোচনা দীর্ঘত্বের দিকে এগিয়ে না গেলে আরো উদাহরণ টানা যেতো
বই থেকে। কবি এম এ ফাত্তাহ
আপাদমস্তক একজন ইসলামের সঠিক
অনুসারী। ইসলামের জীবনীসত্যে
তিনি এবং তাঁর কবিতা উজ্জীবিত।
আলোচ্য বই’র ৩৯টি কবিতার মাঝে বেশ ক’টা কবিতাই ইসলাম ও
ইসলামের বিধানকে ঘিরে। মসৃণ
কাগজে ঝকঝকে তকতকে বইটি
ছাপিয়েছে কবি কামরুজ্জামান
হেলাল’র ‘স্বর্ণলিপি’ প্রকাশনী।
গ্রন্থস্বতে¦ রয়েছেন ‘প্রশান্তির বরষা বর্ষিলে তুমি’ কবিতার
‘তুমি’। উৎসর্গের পৃষ্টা জুড়ে আছেন
কবির গর্বিত স্বর্গত বাবা ও মা।
‘সৃষ্টির জয়োল্লাসে রাঙাই
নিজেকে’ কাব্যগ্রন্থের জনক এম এ
ফাত্তাহ ২১-০৩-১৯৭২ সালে সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার উত্তর
মাদারখাল গ্রামে জন্মগ্রহণ
করেন। তাঁর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
বই’র দ্বিতীয় ফ্ল্যাপ’রও সৌন্দর্য
বর্ধন করেছে।
নিভৃতচারী আত্মপ্রচারবিমুখ বিদগ্ধ এ কবি অবিরাম লিখে
চলেছেন। ২০১৬ এর একুশে
বইমেলায় এ গ্রন্থ তাঁর প্রথম
প্রকাশিত গ্রন্থ হলেও আরো রয়েছে
শত শত অগ্রন্থিত কাব্য। (সেগুলোও
অতি দ্রুত মলাটবদ্ধ করার জোর দাবি জানাচ্ছি।) ‘অনাগত নতুনের
সন্ধানে’ তাঁর আগামী হোক
কণ্টকমুক্ত, তাঁর পথ হোক
কুসুমাস্তীর্ণ। এ আমাদের হৃদয়ের
আকুতি। এয়াকুব আলী চৌধুরী’র
ভাষায় কবিকে বলব- “দেহের ক্ষুধায় তুমি অবশ
নও,শরীরের যন্ত্রণায় তুমি কাতর
নও, দুঃখে তুমি ক্ষুণ্ন নও। তুমি
জ্যোতির সাগর,জ্ঞানের মহাসাগর,
আনন্দের তরঙ্গ। কালের আবর্তনে
তোমার ক্ষয় নাই। তুমি বিরাট মহামুহূর্তে এক অনন্ত শক্তির
প্রভায় উৎপন্ন হয়েছো। তুমি
অনন্তকাল কাল ধরে, অনন্তযুগ যুগ
ধরে বিদ্যমান থাকবে। তুমি
থাকবে। তুমি থাকবে।”
তোমাকে থাকতে হবে। এ আমার একার কথা না। এয়াকুব আলী’র
জবানে হাজার পাঠকের হৃদয়ের
কথা।
লেখক:আলী হাফিজ
সম্পাদক:স্বপ্নস্বর

All reacti

No comments

Powered by Blogger.