Header Ads

Header ADS

ভোর হলো দোর খোলো


 ভোর হলো দোর খোলো

আলী হাফিজ
“বুঝলি কিরে দুষ্টু/ কী যে হলুম তুষ্টু/ পেয়ে তোর ঐ পত্র!/ যদিও তিন ছত্র/ যদিও তোর অক্ষর/ হাত পা যেন যক্ষর,/ পেটটা কারুর চিপসে,/ পিঠটে কারুর টিপসে/ ঠ্যাংটা কারুর লম্বা,/ কেউবা দেখতে রম্ভা!/ কেউ যেন ঠিক থাম্বা,/ কেউবা ডাকেন হাম্বা!/ থুতনো কারুর উচ্চে,/ কেউবা ঝুলেন পুচ্ছে!/”
এমন রসসমৃদ্ধ ও হৃদয়কাড়া ছন্দ শিশুদের জন্য যিনি রেখে গেছেন, তিনি কাজী নজরুল ইসলাম।ছন্দের তরঙ্গ যেন আছড়ে পড়ে শিশুদের প্রাণে প্রাণে। ছন্দের নৃত্যে তারা মেতে থাকেন গানে গানে। হাসতে হাসতে ঠোঁটস্ত করে নেয় ছড়া। মুগ্ধতার ভেতর খুঁজে নেয় শিক্ষা।
তিনি যে শুধু বড়দের জন্য লিখতেন এমন নয় । ছোটদের জন্য তার অনেক অনেক রচনা বিদ্যমান।
কবি-দৌহিত্র খিলখিল কাজী সম্পাদিত ‘ছোটদের নজরুল রচনাবলী’ আরেকবার হাজির করল শিশুপ্রিয় কাজীকে । তার শিশুরাজ্যে প্রবেশ করে অবাক হতে হয় । বিচিত্র কৌশলে শিশুদেরকে আকর্ষণ করেন এই কবি।
কোনো সময় তার ছড়ায় জাগে হাসির ঝিলিক , আবার কোনো সময় মিলে চিন্তার খোরাক। মিলে জেগে ওঠার চেতনা, জাগিয়ে তোলার প্রেরণা। আবার প্রকৃতিকেও এমন সুন্দর করে উপস্থাপন করেন যা কেবল তিনিই পারেন। তার ছড়ায় আছে সুন্দরের বর্ণনা। আছে স্বচ্ছ ইতিহাসের নির্মল বিবরণ । আছে ঈমানের, বিশ্বাসের কথা। দেখুন তার ‘অভিযান’ কবিতাটি। কীভাবে তিনি শিশুদেরকে ‘অভিযান’র প্রতি আহবান করেন-
“নতুন পথের যাত্রা-পথিক
চালাও অভিযান!
উচ্চকণ্ঠে উচ্চারো আজ
“মানুষ মহিয়ান।”
চারদিকে আজ ভীরুর মেলা
খেলবি কে আয় নতুন খেলা?
জোয়ার জলে ভাসিয়ে ভেলা
বাইবি কি উজান?
পাতাল ফেড়ে চলবি মাতাল
স্বর্গে দিবি টান।”
...
“অভিযানের বীর সেনাদল
জ্বালাও মশাল, চল আগে চল!
কুচকাওয়াজের বাজাও মাদল,
গাও প্রভাতের গান!
ঊষার দ্বারে পৌঁছে গাবি
‘জয় নব উত্থান’।”
কিংবা দেখুন-
“ছোট আজ ফুল্কি যারা
না দেখা অগ্নি-গিরির ভাই তাহারাই ভগ্নি তারা!
আকাশের মানিক মোতি জ্যোতির্ধারা,
আমাদের আশার প্রদীপ, নয়ন-তারা,
পাথরে ঘুম-ভাঙ্গানো প্রাণ-ফোয়ারা
ফুটিয়া ঐ এল রে! ছুটিয়া ঐ এল রে!
চবুতরার কবুতর আকাশের পথ পেল রে!
আসে কার পাল্কি ছুটে?
কে আসে উড়িয়ে ধূলি বাংলার শ্যামলা মাঠে
সওয়ার হয়ে র্আবি উটে?
আগুনের ফুল্কি ছুটে ফুল্কি ছুটে! ”
কবি কাজী নজরুল ইসলাম কী নরম ভাষায় বাচ্চাদেরকে উপদেশ দেন! প্রতিটি শব্দই যেন শিশুমনে দাগ কেটে যায়। চাষীকে সম্মান জানাতে হবে এর পেছনে যুক্তি দাঁড় করিয়ে তিনি বলেন-
“চাষীকে কেউ চাষা বলে
করিও না ঘৃণা,
বাঁচতাম না আমরা কেহ
ঐ সে কৃষাণ বিনা।
রৌদ্রে পুড়ে বৃষ্টিতে সে
ভিজে দিবা রাতি
মোদের ক্ষুধায় অন্ন জোগায়
চায় নাকো সে খ্যাতি।”
ঘরকোণো অভ্যাস নজরুল কোনদিন পছন্দ করেন নি।কারোর বেলায় না।তাই নজরুল শিশুদেরকে ডাকেন-
“জাগো দুস্তর পথের নবযাত্রী
জাগো জাগো!
ঐ পোহাল তিমির রাত্রী!
জাগো জাগো!”
আবার তিনি প্রভাত-বেলায় সকল শিশুদের দরজায় দরজায় সকালের আলো হয়ে কড়া নাড়েন। আর তাদের ডাক দিয়ে বলেন-
“ভোর হলো/দোর খোলো/খুকুমণি ওঠো রে!/ঐ ডাকে/যুঁই শাখে/ফুল খুকি ছোটো রে!/খুকুমণি ওঠো রে !/
...
ত্যাজী নীড়/করে ভিড়/ওড়ে পাখি আকাশে,/এন্তার/গান তার/ভাসে ভোর বাতাসে/
এভাবেই শিশুদেরকে ডেকে ডেকে তিনি ঘুম থেকে জাগান। কারণ, শিশুরা যদি ঘুমিয়ে থাকে তাহলে আগামী অন্ধকার। একটা শিশুই পারে পৃথিবী পাল্টে দিতে।পাল্টে দিতে পারে হাজারো অসতর্ক মানুষের জীবনের মোড়।কাজী নজরুল শিশু হয়ে তার সংকল্পের কথা বলেন, এবং অন্যকে বলতে উদ্বুদ্ধ করেন। তার সংকল্প
“থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে,
দেখব এবার জগতটাকে
কেমন করে ঘুরছে মানুষ
যুগান্তরের ঘুর্ণিপাকে।
দেশ হতে দেশ দেশান্তরে
ছুটছে তারা কেমন করে
কিসের নেশায় কেমন করে
মরছে যে বীর লাখে লাখে
কিসের আশায় করছে তারা
বরণ মরণ যন্ত্রনাকে।”
নজরুল এতো কিছুর মাঝে ও ভুলে যান না তার ধর্মের কথা। তার পালনকর্তার কথা। সৃষ্টিকর্তার নিকট কীভাবে প্রার্থনা করতে হয়, শিশুদেরকে তা শিখাতে তিনি ভুলে যান নি।
“আমারে সকল ক্ষুদ্রতা হতে
বাঁচাও প্রভূ উদার।
হে প্রভূ,শেখাও-নীচতার চেয়ে
নীচ পাপ নাহি আর ।
যদি শতেক জন্ম-পাপে হই পাপী
যুগ যুগান্তর নরকেও যাপি
জানি জানি প্রভূ,তারও আছে ক্ষমা,
ক্ষমা নাই নীচতার।
ক্ষুদ্র করো না হে প্রভূ আমার
হৃদয়ের পরিসর,
যেন হৃদয়ে আমার সম ঠাঁই পায়
শত্রু-মিত্র পর।
নিন্দা না করি ঈর্ষায় কারো
অন্যের সুখে সুখ পাই আরো
কাঁদি তারি তরে অশেষ দুঃখী
ক্ষুদ্র আত্মা যার।”
এ ছাড়া সৃষ্টিকর্তার বন্দনায়- ‘এই সুন্দর ফুল সুন্দর ফল মিঠা নদীর পানি...’,
নবি সা. এর শানে- ‘ত্রিভূবনের প্রিয় মোহাম্মদ এল রে দুনিয়ায়...’,
ঈদোৎসবের গান- ‘ও মন, রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ...’।
এসব ধ্রুপদী কালজয়ী গান কেউ কোনোদিন ভুলতে পারবে?
কবি-দৌহিত্র খিলখিল কাজী সম্পাদিত ‘ছোটদের নজরুল রচনাবলী’ আমাদের দৃষ্টিতে আরেকবার সম্পাদনা করা উচিৎ। কারণ, ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’, ‘খালেদ’, ‘খেয়াপারের তরণী’, ‘ফরিয়াদ’, ফাতেহা-ই- দোয়াজদহম’, ও ‘বিদ্রোহী’ সহ অনেক রচনা আছে যেগুলো আমাদের মনে হয় শিশুতোষ নয়।এগুলোর শব্দালংকার ও অর্থালংকার অনেক ক্ষেত্রে বুড়োদেরকেও ভাবিয়ে তোলে!

No comments

Powered by Blogger.